একবিংশ শতাব্দীতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিস্ময়কর সব উন্নতির মাঝেও একটি নীরব মহামারি আমাদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে, যা 'অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স' বা এএমআর (AMR) নামে পরিচিত। ২০২৬ সালে এসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই সমস্যাকে মানবজাতির জন্য শীর্ষ ১০টি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য হুমকির একটি হিসেবে ঘোষণা করেছে।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কী এবং কেন হয়?
সহজ কথায়, যখন শরীরের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়াগুলো ওষুধের (অ্যান্টিবায়োটিক) বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা অর্জন করে এবং ওষুধগুলো তাদের মারতে ব্যর্থ হয়, তখনই তাকে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বলা হয়। এটি মূলত ওষুধের বিবর্তন নয়, বরং ব্যাকটেরিয়ার অভিযোজন ক্ষমতা।
গবেষণায় দেখা গেছে, এর প্রধান কারণগুলো হলো:
অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার: ভাইরাল ইনফেকশন বা সাধারণ সর্দি-কাশিতে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন।
অসম্পূর্ণ কোর্স: সুস্থ বোধ করার সাথে সাথেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া।
প্রেসক্রিপশন ছাড়া কেনা: রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ফার্মেসি থেকে সরাসরি অ্যান্টিবায়োটিক সংগ্রহ।
পশুপালন ও কৃষিতে ব্যবহার: গবাদি পশুর বৃদ্ধিতে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে তা খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে।
গবেষণার বর্তমান উপাত্ত (২০২৬)
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর বিশ্বে কয়েক মিলিয়ন মানুষ এমন সংক্রমণে মারা যাচ্ছেন যা আগে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েই নিরাময় সম্ভব ছিল। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় এবং বাংলাদেশে টাইফয়েড, যক্ষ্মা (TB) এবং নিউমোনিয়ার মতো রোগের ব্যাকটেরিয়াগুলো এখন প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। আইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন রোগীদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, 'লাস্ট রিসোর্ট' বা সর্বশেষ শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকগুলোও অনেক সময় কাজ করছে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও ঝুঁকি
বাংলাদেশে এই ঝুঁকি আরও প্রকট কারণ এখানে ওষুধের সহজলভ্যতা। শহর থেকে গ্রামের সাধারণ ফার্মেসিগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির ক্ষেত্রে কড়াকড়ি থাকলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। গবেষকরা বলছেন, যদি এখনই লাগাম টেনে ধরা না যায়, তবে ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বে ক্যানসারের চেয়েও বেশি মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে মারা যেতে পারে।
আমাদের করণীয়: সুরক্ষার পথ
মেডেক্সইনফো-র পক্ষ থেকে আমরা ৫টি মূল পয়েন্ট চিহ্নিত করেছি যা আমাদের এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে:
১. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ নয়: সামান্য জ্বর বা ব্যথায় নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া বন্ধ করতে হবে।
২. পুরো ডোজ সম্পন্ন করা: চিকিৎসকের দেওয়া ডোজ শেষ না করলে বেঁচে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলো 'সুপারবাগ' হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
৩. ব্যক্তিগত সচেতনতা: নিয়মিত হাত ধোয়া, পরিষ্কার খাবার গ্রহণ এবং টিকাদান কর্মসূচি মেনে চললে সংক্রমণের হার কমে, যা অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেয়।
৪. ফার্মাসিস্টের ভূমিকা: প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি না করার শপথ নিতে হবে।
৫. খাদ্যাভ্যাস: প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত খাবার এবং অ্যান্টিবায়োটিক-মুক্ত পোল্ট্রি পণ্য গ্রহণে গুরুত্ব দিতে হবে।
অ্যান্টিবায়োটিক ছিল বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারগুলোর একটি। কিন্তু আমাদের অসচেতনতা একে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব হলো এই জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সম্মান বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
মনে রাখবেন, সঠিক তথ্যই সুস্থ জীবনের ভিত্তি। মেডেক্সইনফো সর্বদা আপনার পাশে আছে সঠিক স্বাস্থ্য সচেতনতা পৌঁছে দিতে।

কোন মন্তব্য নেই: