পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও অনুগত প্রাণী হিসেবে কুকুরের স্থান সবার উপরে। সৃষ্টির শুরু থেকে কুকুর মানুষের পাশে থেকেছে কখনো পাহারাদার হিসেবে, কখনো শিকারি সঙ্গী হিসেবে, আবার কখনো বা নিঃস্বার্থ বন্ধু হিসেবে। বিজ্ঞানীদের মতে, কুকুরই প্রথম প্রাণী যাকে মানুষ গৃহপালিত করতে সক্ষম হয়েছিল। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কুকুরের জনপ্রিয়তা এবং মানুষের জীবনে এদের প্রভাব অপরিসীম।
কুকুরের বিবর্তন ও ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত রূপ
গবেষকদের মতে, প্রায় ১৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ বছর আগে নেকড়ে থেকে কুকুরের বিবর্তন ঘটেছিল। প্রাচীনকালে শিকারি মানুষেরা যখন বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত, তখন নেকড়েরা খাবারের সন্ধানে মানুষের আস্তানার আশেপাশে আসত। ধীরে ধীরে এদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষ কুকুরের প্রজনন ঘটিয়েছে, যার ফলে বর্তমানে পৃথিবীতে কয়েকশ প্রজাতির কুকুর দেখা যায়—যেমন পাহারাদারির জন্য জার্মান শেফার্ড, বুদ্ধিমত্তার জন্য গোল্ডেন রিট্রিভার, আবার ছোট ও আদুরে হিসেবে পাগ বা পমেরিনিয়ান।
কুকুরের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও ঘ্রাণশক্তি
কুকুরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাদের প্রখর ঘ্রাণশক্তি এবং শোনার ক্ষমতা। মানুষের তুলনায় কুকুরের ঘ্রাণশক্তি প্রায় ১০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ গুণ বেশি শক্তিশালী। এই ক্ষমতার কারণেই পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে অপরাধী শনাক্ত করতে এবং লুকানো বিস্ফোরক খুঁজে বের করতে কুকুর ব্যবহার করা হয়। এছাড়া কুকুর মানুষের গলার স্বর এবং শারীরিক ভাষা বুঝতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি প্রাপ্তবয়স্ক কুকুর প্রায় ১৫০ থেকে ২০০টি মানুষের শব্দ বা সংকেত মনে রাখতে পারে, যা একটি ২-৩ বছরের শিশুর বুদ্ধিমত্তার সমান।
কুকুরের প্রকারভেদ ও প্রজাতি
কুকুরকে সাধারণত তাদের কাজের ধরন অনুযায়ী কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়: ১. শিকারি কুকুর: যেমন বিগল বা ল্যাব্রাডর। ২. পাহারাদার কুকুর: যেমন ডোবারম্যান, রটওয়াইলার বা জার্মান শেফার্ড। এরা নিজের এলাকা ও মালিককে রক্ষা করতে জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকে। ৩. শৌখিন বা ছোট কুকুর: যেমন শিহ-জু, পাগ বা চিহুয়াহুয়া। এরা মূলত ইনডোর বা ঘরের ভেতরে পালার জন্য জনপ্রিয়। ৪. দেশি কুকুর: বাংলাদেশের স্থানীয় কুকুরগুলো অত্যন্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং বুদ্ধিমান হয়। এদের আলাদা করে রক্ষণাবেক্ষণের খরচও খুব কম।
কুকুরের সঠিক যত্ন ও লালন-পালন
একটি কুকুর পোষা মানে একটি নতুন সদস্যকে পরিবারে গ্রহণ করা। এর জন্য কিছু দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত জরুরি:
১. পুষ্টিকর খাবার: কুকুরের সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার প্রয়োজন। গরুর মাংস, মুরগির মাংস বা মাছ সেদ্ধ করে ভাতের সাথে দেওয়া যেতে পারে। তবে মনে রাখবেন, চকলেট, পেঁয়াজ, রসুন, চা-কফি এবং অতিরিক্ত মশলাযুক্ত খাবার কুকুরের জন্য বিষাক্ত হতে পারে।
২. বাসস্থান ও পরিচ্ছন্নতা: কুকুরের থাকার জায়গা সবসময় শুকনো ও পরিষ্কার রাখা উচিত। এদের নিয়মিত গোসল করানো এবং লোম আঁচড়ে দেওয়া প্রয়োজন যাতে চর্মরোগ না হয়।
৩. ব্যায়াম ও খেলাধুলা: কুকুর শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকতে পছন্দ করে। প্রতিদিন অন্তত ২০-৩০ মিনিট কুকুরকে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করা বা খোলা জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করানো উচিত। এতে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যও ভালো থাকে।
৪. চিকিৎসা ও টিকাদান: কুকুর পালনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ভ্যাকসিন বা টিকাদান। বিশেষ করে 'র্যাবিস' বা জলাতঙ্ক রোগের টিকা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া নিয়মিত কৃমির ওষুধ এবং পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও কুকুরের অবদান
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে 'পেট থেরাপি' (Pet Therapy) একটি স্বীকৃত বিষয়। একাকীত্ব, বিষণ্ণতা এবং দুশ্চিন্তা কমাতে কুকুরের সঙ্গ জাদুর মতো কাজ করে। যখন আপনি একটি কুকুরের সাথে সময় কাটান, তখন মস্তিষ্কে 'অক্সিটোসিন' নামক হরমোন নিঃসৃত হয় যা আনন্দ দেয় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। এছাড়া অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের সামাজিক আচরণ শিখতে কুকুর অনেক বড় ভূমিকা পালন করে।
বেওয়ারিশ বা রাস্তার কুকুরদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব
আমাদের দেশে রাস্তার কুকুরদের অনেক সময় অবহেলা বা নির্যাতনের শিকার হতে হয়। মনে রাখা প্রয়োজন, প্রতিটি জীবের এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। অযথা কুকুরকে ঢিল মারা বা তাদের আশ্রয় নষ্ট করা অমানবিক কাজ। বরং পাড়ার রাস্তার কুকুরগুলোকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা এবং তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা একটি সভ্য সমাজের দায়িত্ব। কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য বর্তমানে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক।
কুকুর কেবল একটি প্রাণী নয়, এটি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক অনন্য উদাহরণ। আপনি তাকে যতটুকুই দেবেন, সে তার চেয়ে অনেক বেশি আপনাকে ফিরিয়ে দেবে। একটি বিশ্বস্ত কুকুর আপনার বাড়ির সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আপনার জীবনের একঘেয়েমি দূর করে এক অনাবিল প্রশান্তি এনে দিতে পারে। তাই প্রাণীদের প্রতি দয়ালু হোন এবং পরিবেশের এই অমূল্য বন্ধুকে যথাযথ সম্মান ও যত্ন দিন।
কুকুর পালন নিয়ে সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
১. কুকুরকে কোন খাবারগুলো দেওয়া একদম নিষিদ্ধ?
উত্তর: কুকুরের জন্য কিছু খাবার অত্যন্ত বিষাক্ত হতে পারে। যেমন—চকলেট, ক্যাফেইন (চা-কফি), পেঁয়াজ, রসুন, আঙ্গুর, কিশমিশ এবং অতিরিক্ত লবণাক্ত বা মশলাযুক্ত খাবার। এছাড়া কাঁচা ডিম বা হাড়ও সাবধানে দেওয়া উচিত।
২. কুকুরের 'র্যাবিস' বা জলাতঙ্ক টিকা কখন দিতে হয়?
২. কুকুরের 'র্যাবিস' বা জলাতঙ্ক টিকা কখন দিতে হয়?
উত্তর: সাধারণত কুকুরের বাচ্চার বয়স ৩ মাস হলে প্রথম জলাতঙ্ক (Anti-Rabies) টিকা দিতে হয়। এরপর পশুচিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতি বছর একবার বুস্টার ডোজ দেওয়া জরুরি।
৩. কুকুরকে কতদিন পরপর গোসল করানো উচিত?
৩. কুকুরকে কতদিন পরপর গোসল করানো উচিত?
উত্তর: আবহাওয়া এবং কুকুরের প্রজাতিভেদে এটি ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণত মাসে ২ থেকে ৩ বার গোসল করানোই যথেষ্ট। অতিরিক্ত গোসল করালে কুকুরের ত্বকের প্রাকৃতিক তেল নষ্ট হয়ে চর্মরোগ হতে পারে।
৪. রাস্তার বা দেশি কুকুর কি পোষ মানানো সম্ভব?
৪. রাস্তার বা দেশি কুকুর কি পোষ মানানো সম্ভব?
উত্তর: অবশ্যই। দেশি কুকুর অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং বাংলাদেশের আবহাওয়ার উপযোগী। ছোটবেলা থেকে বা সঠিক প্রশিক্ষণ দিলে দেশি কুকুর বিদেশি কুকুরের চেয়েও বেশি বিশ্বস্ত এবং সাহসী হয়ে ওঠে।
৫. কুকুরের কৃমির ওষুধ কেন জরুরি?
৫. কুকুরের কৃমির ওষুধ কেন জরুরি?
উত্তর: কুকুরের পেটে কৃমি হলে তার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটে এবং ওজন কমে যায়। কৃমি থাকলে কুকুরের শরীর থেকে রোগ মানুষের শরীরেও ছড়াতে পারে। তাই প্রতি ৩ মাস অন্তর কৃমির ওষুধ খাওয়ানো প্রয়োজন।
৬. কুকুর কেন সবসময় ঘেউ ঘেউ করে?
৬. কুকুর কেন সবসময় ঘেউ ঘেউ করে?
উত্তর: ঘেউ ঘেউ করা কুকুরের ভাব বিনিময়ের একটি মাধ্যম। ভয় পেলে, অপরিচিত কাউকে দেখলে, খিদের জ্বালায় অথবা মালিকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে তারা শব্দ করে। অতিরিক্ত ঘেউ ঘেউ করলে বুঝতে হবে সে কোনো কারণে মানসিক চাপে বা শারীরিক কষ্টে আছে।

কোন মন্তব্য নেই: