বিড়াল—সৃষ্টিকর্তার এক চমৎকার সৃষ্টি। এদের তুলতুলে শরীর, মায়াবী চোখ আর চটপটে স্বভাবের কারণে বিশ্বজুড়ে বিড়াল অন্যতম জনপ্রিয় পোষা প্রাণী। কেউ এদের পালেন একাকীত্ব দূর করতে, আবার কেউ বা কেবল শখের বশে। তবে বিড়াল কেবল একটি প্রাণী নয়, এরা অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং স্বাধীনচেতা এক সত্তা। প্রাচীন মিশরের রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু করে বর্তমানের আধুনিক ফ্ল্যাট বাড়ি—সবখানেই বিড়ালের রাজকীয় উপস্থিতি লক্ষণীয়।
বিড়ালের ইতিহাস ও বিবর্তন
বিড়ালের সাথে মানুষের সম্পর্কের ইতিহাস প্রায় ১০,০০০ বছরের পুরনো। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের বন্য বিড়াল বা 'আফ্রিকান ওয়াইল্ড ক্যাট' থেকেই আজকের গৃহপালিত বিড়ালের উৎপত্তি। প্রাচীন মিশরে বিড়ালকে দেবতার মতো পূজা করা হতো। এমনকি সে সময় বিড়াল মারার শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। শস্যভাণ্ডার ইঁদুরের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মানুষ প্রথম বিড়ালকে পোষ মানাতে শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে এরা মানুষের ঘরের ভেতরের সদস্য হয়ে ওঠে।
বিড়ালের বৈচিত্র্য ও জনপ্রিয় কিছু প্রজাতি
পৃথিবীতে ছোট-বড় অনেক প্রজাতির বিড়াল দেখা যায়। প্রত্যেকটি প্রজাতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে: ১. পার্সিয়ান বিড়াল (Persian Cat): এদের লম্বা লোম এবং চেপ্টা নাকের কারণে এরা বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। এরা সাধারণত শান্ত স্বভাবের হয়। ২. সিয়ামিজ বিড়াল (Siamese Cat): এরা খুব চটপটে এবং কথা বলতে পছন্দ করে (মিউ মিউ করে মালিকের মনোযোগ টানে)। ৩. মেইন কুন (Maine Coon): এটি পৃথিবীর অন্যতম বড় প্রজাতির বিড়াল। এদের লোম অনেক ঘন এবং এরা বেশ বন্ধুসুলভ। ৪. দেশি বিড়াল: বাংলাদেশের স্থানীয় বিড়ালগুলো অত্যন্ত চতুর এবং রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন হয়। এদের যত্নের খরচও অনেক কম।
বিড়ালের স্বভাব ও আচরণ বুঝতে পারা
--বিড়ালকে ভালোভাবে পালতে হলে আগে তার ভাষা বুঝতে হবে।
--পুরপুর (Purring) শব্দ: বিড়াল যখন খুব সুখে থাকে বা আরাম পায়, তখন এক ধরণের ঘরঘর শব্দ করে। তবে অনেক সময় ব্যথা পেলেও তারা এই শব্দ করতে পারে।
--লেজ নাড়ানো: কুকুর খুশি হলে লেজ নাড়ায়, কিন্তু বিড়াল যদি দ্রুত লেজ নাড়ায়, তবে বুঝতে হবে সে রেগে আছে বা বিরক্ত।
--গা ঘষা: বিড়াল যদি আপনার পায়ে গা ঘষে, তার মানে সে আপনাকে ভালোবাসে এবং আপনাকে নিজের এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করছে।
বিড়ালের সঠিক যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণ
একটি সুস্থ ও সুন্দর বিড়ালের জন্য নিচের বিষয়গুলো অনুসরণ করা জরুরি:
১. সঠিক খাদ্যতালিকা: বিড়াল মূলত মাংসাশী প্রাণী। তাদের খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন থাকতে হবে। সেদ্ধ মুরগির মাংস বা মাছ বিড়ালের প্রিয় খাবার। তবে মনে রাখবেন, বিড়ালকে কাঁচা মাছ বা মাংস দেওয়া উচিত নয়, এতে পেটে কৃমি হতে পারে। এছাড়া গরুর দুধ অনেক বিড়ালের হজম হয় না (Lactose intolerance), তাই পরিমিত পরিমাণে দেখে দিতে হবে। বাজারে পাওয়া 'ক্যাট ফুড' দেওয়ার ক্ষেত্রে ভালো ব্র্যান্ড নির্বাচন করুন।
২. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা (Litter Training): বিড়ালের একটি বড় গুণ হলো এরা খুব পরিষ্কার থাকতে পছন্দ করে। এদের জন্য একটি ট্রে-তে বালি বা ক্যাট লিটার নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দিন। বিড়াল সাধারণত সেখানেই মলমূত্র ত্যাগ করবে। প্রতিদিন লিটার পরিষ্কার করা স্বাস্থ্যসম্মত।
৩. লোম ও নখের যত্ন: বিড়াল নিজেই নিজেকে চাটতে পছন্দ করে, যা তাদের শরীর পরিষ্কার রাখে। তবে পার্সিয়ান বিড়ালের ক্ষেত্রে প্রতিদিন লোম আঁচড়ে দিতে হয়। মাসে একবার নখ কেটে দেওয়া এবং পরিষ্কার কাপড় দিয়ে চোখ মুছে দেওয়া ভালো।
৪. চিকিৎসা ও টিকাদান: বিড়ালকে বিভিন্ন মরণব্যাধি থেকে বাঁচাতে টিকাদান (Vaccination) অত্যন্ত জরুরি। বিড়ালের জন্য বিশেষ করে 'ট্রাইক্যাট' বা 'প্যান লিউকোপেনিয়া' টিকা দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া প্রতি ৩ মাস অন্তর কৃমির ওষুধ খাওয়াতে হবে।
মানুষের জীবনে বিড়ালের উপকারিতা
গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বাড়িতে বিড়াল থাকলে মানুষের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি প্রায় ৩০% কমে যায়। বিড়ালের গায়ের ঘরঘর (Purr) শব্দের কম্পন মানুষের হাড়ের ব্যথা উপশমে এবং মানসিক প্রশান্তিতে সাহায্য করে। যারা বিষণ্ণতা বা একাকীত্বে ভুগছেন, তাদের জন্য বিড়ালের সঙ্গ ঔষধের মতো কাজ করে।
বিড়াল নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
অনেকে মনে করেন বিড়াল অকৃতজ্ঞ প্রাণী, কিন্তু ধারণাটি ভুল। কুকুর যেমন আনুগত্য দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করে, বিড়াল ভালোবাসা প্রকাশ করে বিশ্বাসের মাধ্যমে। আপনার আশেপাশে বিড়াল যদি নিশ্চিন্তে ঘুমায়, তবে বুঝবেন সে আপনাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ মানুষ মনে করে। এছাড়া বিড়াল নিয়ে অলক্ষুণে ভাবার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
রাস্তার বিড়ালদের প্রতি মানবিকতা
আমাদের আশেপাশে অনেক বেওয়ারিশ বিড়াল অভুক্ত অবস্থায় থাকে। ইসলামসহ প্রায় সব ধর্মেই প্রাণীদের খাওয়ানোর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আপনার ঘরের বাড়তি খাবারটুকু বা একটু পরিষ্কার পানি রাস্তার বিড়ালগুলোকে দিলে তারা বেঁচে থাকতে পারে। নিষ্ঠুরভাবে বিড়াল তাড়ানো বা তাদের আঘাত করা থেকে বিরত থাকা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
বিড়াল কেবল একটি শৌখিন প্রাণী নয়, এরা আমাদের পরিবেশ এবং জীবনের একটি সুন্দর অংশ। তাদের সঠিক যত্ন নিলে তারা হয়ে ওঠে পরিবারের অন্যতম সদস্য। আপনি যদি একটি বিড়াল পালার সিদ্ধান্ত নেন, তবে মনে রাখবেন এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী দায়িত্ব। ভালোবাসা এবং সঠিক যত্নের বিনিময়ে আপনি পাবেন এক অকৃত্রিম এবং মায়াবী বন্ধু।
বিড়াল পালন নিয়ে কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: বিড়াল কি অন্ধকারে দেখতে পায়?
উত্তর: বিড়াল সম্পূর্ণ অন্ধকারে দেখতে পায় না, তবে মানুষের তুলনায় অল্প আলোতেও তারা অনেক পরিষ্কার দেখতে পায়।
প্রশ্ন: বিড়ালকে কি গোসল করানো উচিত?
উত্তর: বিড়াল পানি অপছন্দ করে এবং নিজেই নিজেকে পরিষ্কার রাখে। তবে খুব বেশি নোংরা হলে বা চর্মরোগ থাকলে মাসে একবার হালকা কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করানো যেতে পারে।
প্রশ্ন: বিড়াল ঘাস খায় কেন?
উত্তর: বিড়াল অনেক সময় হজমের সমস্যায় পড়লে বা পাকস্থলী থেকে লোমের বল (Hairball) বের করতে ঘাস খেয়ে বমি করার চেষ্টা করে। এটি তাদের প্রাকৃতিক চিকিৎসা।

কোন মন্তব্য নেই: