ম্রো বা মুরং সম্প্রদায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন আদিবাসী জনগোষ্ঠী। প্রধানত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং রাঙামাটি অঞ্চলে তারা বসবাস করে। পাহাড়ি অঞ্চলের এই সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা, জীবনধারা, সামাজিক নিয়ম এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, যা তাদের বিশেষভাবে আলাদা ও স্বতন্ত্র পরিচয় প্রদান করে।
ইতিহাস ও উত্পত্তি
ম্রো জনগোষ্ঠী ইতিহাসে অন্যতম প্রাচীন সম্প্রদায়। প্রাচীন কালের নথি এবং আঞ্চলিক ইতিহাস অনুযায়ী, তারা মূলত পাহাড়ি এলাকার কৃষক সম্প্রদায়। প্রাচীন সময়ে ম্রোরা বনজঙ্গল ও পাহাড়ের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতো। তাদের জীবনে শিকার, মৎস্য আহরণ, কৃষি এবং বুনন ছিল প্রধান জীবনধারার অংশ। প্রাচীন কিংবদন্তি ও লোককাহিনী ম্রোদের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই গল্পগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রেরিত হয়ে তাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করেছে।
ম্রো সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা ‘ম্রো ভাষা’ বা ‘মুরং ভাষা’। এটি ইন্দো-আর্য ও তিব্বত-বর্মীয় ভাষার প্রভাবসহ একটি অনন্য ভাষা। ম্রো ভাষা মৌখিক সাহিত্য সমৃদ্ধ, যেখানে গল্প, প্রবাদ, গান ও লোককথা অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে তাদের “হেলাং” গান বা নৃত্য-কবিতা জনপ্রিয়, যা সামাজিক অনুষ্ঠান, উৎসব এবং শস্য সংগ্রহের সময় পরিবেশিত হয়। এছাড়া, তাদের কল্পকাহিনী ও নৃত্যগীতি প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের সংমিশ্রণ।
সামাজিক জীবন ও সম্প্রদায় ব্যবস্থা
ম্রো সম্প্রদায়ের সমাজ গোষ্ঠীভিত্তিক এবং গ্রামীণভাবে সংগঠিত। সাধারণত এক গ্রামের মানুষ পারস্পরিক সহায়তা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে জীবনযাপন করে। বয়স্কদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং কন্যাশিশুদের প্রতি যত্ন তাদের সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সম্প্রদায়ে বিবাহ, সম্পত্তি বণ্টন, শাস্তি ও সামাজিক নিয়মাবলী কঠোরভাবে পালিত হয়। শাসক বা মুরং গ্রামপ্রধান প্রায়শই গ্রামের শান্তি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
ম্রোদের ধর্মীয় বিশ্বাস প্রাকৃতিক উপাদান ও পূর্বপুরুষের সন্মানকে কেন্দ্র করে গঠিত। তারা পাহাড়, নদী, বনজঙ্গলের দেবতা ও পূর্বপুরুষকে পূজা করে। বিশেষ উৎসব ও আচার যেমন ফসল কাটার সময় বা নববর্ষ উদযাপন তাদের জীবনের অঙ্গ। এই উৎসবগুলিতে নৃত্য, গান ও হস্তশিল্প প্রদর্শন করা হয়। ধর্মীয় আচার তাদের সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রেরিত হয়।
শিল্পকলা ও পোশাক
ম্রো সম্প্রদায়ের কারুশিল্প, পোশাক ও গহনার নিদর্শন তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রকাশ করে। মহিলারা হাতে বোনা বস্ত্র ও রঙিন গয়না ব্যবহার করে। পুরুষরা সাধারণত সাদাসিধে পোশাক পরিধান করেন। কাঠের খোদাই, বাঁশের কাজ, হস্তশিল্প ও পাথরের নকশা ম্রো সমাজের জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। বিশেষ উৎসবের সময়, নৃত্য ও গানসহ ঐতিহ্যবাহী পোশাক প্রদর্শন করা হয়।
ম্রো সম্প্রদায়ের জীবনধারা মূলত কৃষিভিত্তিক। তারা ধান, সবজি, ফলমূল ও মুগ ডাল চাষ করে। এছাড়া, পশুপালন, মৎস্য আহরণ ও পাহাড়ে শিকার তাদের জীবিকার অংশ। সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটন ও হস্তশিল্প থেকে অতিরিক্ত আয়ও আসে। তবে, পাহাড়ের ভূমি হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাব তাদের জীবনে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য
ম্রো সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার হার তুলনামূলকভাবে কম। সরকারি বিদ্যালয় ও এনজিওগুলোর উদ্যোগে শিক্ষার প্রসার ঘটলেও এখনও অনেক গ্রামে শিক্ষার অবকাঠামো সীমিত। স্বাস্থ্যসেবাও একইভাবে সীমিত, যার ফলে সাধারণ রোগ, খাদ্য ও পুষ্টি সংক্রান্ত সমস্যা বেশী দেখা যায়। সম্প্রদায়ের উন্নয়নে শিক্ষার প্রসার ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি অপরিহার্য।
ম্রো সম্প্রদায় আজ নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। পাহাড়ের ভূমি হ্রাস, পর্যটন চাপ, আধুনিকায়ন এবং সামাজিক পরিবর্তন তাদের ঐতিহ্য ও জীবনধারায় প্রভাব ফেলছে। সরকার, এনজিও এবং সামাজিক সংস্থাগুলো সম্প্রদায়ের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অধিকার এবং জীবিকার উন্নয়নে কাজ করছে। এই প্রচেষ্টা ম্রো সম্প্রদায়কে তাদের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত পরিচয় রক্ষা করতে সহায়তা করবে।
ম্রো বা মুরং সম্প্রদায় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি অনন্য উপাদান। তাদের ভাষা, জীবনধারা, শিল্পকলা, উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠান একত্রে একটি সম্পূর্ণ সমাজের ছবি ফুটিয়ে তোলে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে এবং শিক্ষার প্রসার ও আধুনিক সুবিধার সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে এই সম্প্রদায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবে অব্যাহত থাকবে।





কোন মন্তব্য নেই: