বাংলাদেশে আজ সবচেয়ে বড় আতঙ্ক শুধু অপরাধ নয়, অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি। মানুষ এখন খুন, ধর্ষণ, নির্যাতনের খবর শুনে আগের মতো অবাক হয় না। কারণ তারা জানে, কিছুদিন আলোচনা হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়াবে, তারপর সব ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যাবে। কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবারের কান্না কখনো থামে না।
৭ বছরের শিশু রামিসার ধর্ষণ ও গলা কেটে হত্যার ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একটি নিষ্পাপ শিশুকে যেভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই ঘটনার পর শিশুটির বাবার মুখে বিচার ব্যবস্থার প্রতি যে ঘৃণা ও হতাশা প্রকাশ পেয়েছে, সেটি আজ লাখো মানুষের মনের কথাই তুলে ধরেছে।
একজন বাবা যখন নিজের সন্তানের জন্য বিচার পাওয়ার আশাই হারিয়ে ফেলেন, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ভয়ংকরভাবে দুর্বল হয়ে গেছে। কারণ সাধারণ মানুষ আদালতের দিকে তাকিয়ে থাকে শেষ আশ্রয় হিসেবে। সেখানে যদি ভরসা না থাকে, তাহলে সমাজে ক্ষোভ বাড়বে, অস্থিরতা বাড়বে, আর মানুষ আইনের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করবে।
বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা যেন দিন দিন স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন সংবাদ খুললেই শিশু ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, হত্যার খবর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত ঘটনার পরও অপরাধীরা কেন ভয় পায় না? কারণ তারা জানে, প্রভাব, ক্ষমতা, টাকা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে অনেক সময় আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়া যায়। আর এই সংস্কৃতিই অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
রামিসার মতো একটি শিশুও যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে আমরা কিসের উন্নয়ন নিয়ে গর্ব করি? বড় বড় সেতু, মেট্রোরেল, উন্নয়নের গল্প তখন অর্থহীন হয়ে যায়, যখন একটি শিশু নিজের জীবনটুকু নিরাপদ রাখতে পারে না। একটি সভ্য রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো তার শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
মানুষ আজ দৃষ্টান্তমূলক বিচার চায়। তবে সেই বিচার অবশ্যই আইনের মধ্য দিয়েই হতে হবে। বিচার দ্রুত হতে হবে, স্বচ্ছ হতে হবে, এবং এমন হতে হবে যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন নৃশংস অপরাধ করার সাহস না পায়। বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়ানো।
রামিসা আর ফিরবে না। কিন্তু তার বাবার কান্না, তার মায়ের আহাজারি, আর পুরো দেশের মানুষের ক্ষোভ যেন আরেকটি “ট্রেন্ডিং বিষয়” হয়ে হারিয়ে না যায়। এই ঘটনার বিচার শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো দেশের মানুষের ন্যায়বিচারের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য জরুরি।
